“ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার” একজন সৎ অফিসারের গল্প

একজন নিজের মতে নিজের পথে চলা মানুষের কথা বলি।
মাহমুদ হাসান।আমার প্রিয় মুকুল কাকা।বর্তমানে ময়মনসিংহ বিভfগের কমিশনার।কিছুদিন আগে দুদকের মহাপরিচালক ছিলেন।তার আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ছিলেন – তার আগে ছিলেন হবিগঞ্জের ডি সি।তিনি বাংলাদেশের প্রশাসনে সততার প্রতীক ।
তিনি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের- স্কুল মাষ্টারের ছেলে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন।টিউশনি করে পড়ালেখা করেছেন ।তাঁর ছাত্রদের একজন এখন পরমানু বিজ্ঞানী ডক্টর জাহিদ হাসান তাপস।প্রিন্সটন ভার্সিটির অধ্যাপক ।
তিনি যখন প্রশাসন ক্যাডারে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জয়েন করলেন—এলাকার সবাই বললো এইবার মমতাজ মাষ্টারের কপাল খুলবে।ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট – টাকা আসবে বস্তা বস্তা।কিন্তু টাকা এলো না – ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব যা বেতন পান তা দিয়ে ঠিকমতো সংসারই চলে না ।
তিনি যখন এ সি ল্যান্ড – ইউ এন ও-এ ডি সি-এবং ডিসি –সবখানে আমি গিয়েছি; তার জীবন যাত্রায় কখনোই জৌলুস এলো না।একই জামা কাপড় তাঁর পরিবারের সদস্যদের বছরের পর বছর ধরে পরতে দেখি-খাবার টেবিলেও বহুপদের আায়োজন থাকে না।পঞ্চগড় টু চট্টগ্রাম—সাতক্ষীরা টু হবিগঞ্জ – যেখানেই চাকরি ট্রান্সফার হয়; সেই একই আসবাবপত্র তিনি টানাটানি করে নিয়ে যান। হাড়ি-খুড়ি- বিছানার চাদর জানালার পর্দা সবই সাথে যায়।বাড়তি কেনাকাটার টাকা তাঁর কাছে নেই –অথচ হাত বাড়ালেই পেতে পারেন কোটি কোটি টাকা।
মাহমুদ হাসান স্যার পৈত্রিক ভিটারও কোন সংস্কার করতে পারেননি।এখনো বাড়িতে এলে সেই আদিকালের ঘর ভিটেতেই থাকেন।অথচ চাকরিজীবন প্রায় শেষ।তাঁর দুইটি ছেলে –ভীষণ মেধাবী।বড় ছেলে সীমান্ত –জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-কিন্তু বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায় অক্সফোর্ড –ক্যামব্রিজে।
ছোট ছেলেটি –সমুদ্র –এবার এই এস সি পাস করলো –ভাল গান করে।সেও বৃত্তি নিয়ে জার্মান –পোল্যান্ড ভ্রমণে যায়।
মাহমুদ স্যারের স্ত্রী শাহিনা হাসান –সেই অতি সাধারণ একজন ।ভীষণ ভাল মনের এক মহিয়ষি নারী।কবিতা লিখেন।ভালবাসেন নিসর্গ আর মানুষ।সংসারে এক ধরনের অভাব আছেই –কিন্তু অভিযোগ নেই।তিনি স্বামীর সততার পক্ষে।
কিন্তু মাহমুদ স্যার যে জীবনে কিছু করতে পারলেন না –সাধারণ মানুষের এই হতাশার ব্যাখ্যা দিবে কে? কি করতে পারেননি তিনি? ঘুষ খেয়ে দুর্নীতি করে বাড়ি গাড়ি টাকা সম্পত্তি করতে পারেন নি এই তো? একজন সরকারী কর্মকর্তা অসৎ পথে বাড়তি উপার্জন করে তথাকথিত বড়লোক হয়ে ডাটফাটে যোগ্যতার চেয়ে –পদের চেয়ে-রাষ্ট্রের চেয়ে উঁচুতে পা ফেলে চলবেন–এটাই কি আমাদের প্রত্যাশা? আমরা কি জাতি হিসেবেই দুর্নীতির সমর্থক হয়ে পড়েছি?
বাংলাদেশের পুরো প্রশাসন যে তাঁর নাম শুনলেই শ্রদ্ধায় মৌন হয়ে দাঁড়ায়।সরকার যে তাঁকে ক্লিন ইমেজের অফিসার হিসেবে বড় বড় পদে নিয়ে বসায় –এটা কি তাঁর যথার্থ প্রাপ্তি না?
না এটাও যথার্থ প্রাপ্তি না।আমরা অসৎ অফিসারদের তোষামুদ করি ঘৃণাও করি –কিস্ত সৎ অফিসারদের পুরস্কৃত করি না।তাঁদের স্বাধীনতা পদক বা একুশে পদক দেই না।তাঁরা যে সারাজীবন সততা আর অভাব নিয়ে – রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে গেলেন এজন্যে রিটায়ারের পর এককালীন দু চার কোটি টাকাও দেই না।এমন কি পেনসনের টাকাটাও সম্মানের সাথে দেই না।রাষ্ট্র যদি অন্ধ হয় –অজ্ঞ হয় –রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অসততা বাড়বেই।
আমি ‘ম্যাজিস্ট্রেট’ নামের একটি টি ভি নাটক লিখেছি।জাহিদ হাসান ও রোমানা অভিনয় করেছে।এ টি এন বাংলা কয়েকবার প্রচার করেছে।এমন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে একজন সৎ অফিসার হয়ে ওঠা এবং সততা নিয়ে টিকে থাকা কত যে কঠিন কাজ সেটা দেখিয়েছি।সারাদেশ থেকে অনেক ম্যাজিস্ট্রেটএবং প্রশাসনের কর্মকতাগণ আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ বলেছেন।তাঁরা সততার পথে কঠিন প্রতিবন্ধকতার কথা আমাকে জানিয়েছেন।সবকিছুর মূলে আমাদের রাজনৈতিক অসততা।আমাদের রাজনীতি স্বচ্ছ্ব সঠিক আর জবাবদিহীতার ধারায় চলে এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।মাহমুদ হাসান স্যার প্রতিবন্ধকতার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেই মাথা তুলে আছেন সগৌরবে।আমাদের প্রশাসন তাঁকে অনুসরণ করে সঠিক পথে টিকে থাকার উদ্দীপণা লাভ করতে পারে।
মাহমুদ হাসান স্যার মাঝে মধ্যে সস্ত্রীক আমার শালবনে এসে অবসর নেন।উদাস হাওয়ায় পাতা ঝরার দৃশ্য দেখতে দেখতে রিটায়ারের পর কি করবেন তাই নিয়ে ভাবেন।সরকারী বাসা ছেড়ে আসার পর কোথায় থাকবেন?একটি বাড়িও বানানো হলো না –ফ্ল্যাটও কেনা গেলো না; ক’দিন পর ছেলেদের বিয়ে দিতে হবে-ওরা নতুন বউ নিয়ে কোথায় এসে ওঠবে? আমি অভয় দিয়ে বলি –সোজা আমার বাড়িতে এসে উঠবেন সবাই।মাহমুদ স্যার হাসেন –বিড় বিড় করে বলেন-কিন্তু একটা কিছু তো করতে হবে।জিজ্ঞাসা করি –পকেটে কত টাকা আছে? কি করতে চান? বাণিজ্য? তিনি হাসেন।খোঁচা দিয়ে বলি –সারাজীবন ভুল করেছেন, এখনো সময় আছে চোখবুজে হাত পেতে কামিয়ে নিন।তিনি হাসেন –অতি সরল –নিষ্পাপ হাসি।এমন হাসি শুধু একজন সৎ এবং নিষ্ঠাবান মানুষই হাসতে পারেন।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার মাহমুদ হাসান  সম্পর্কে ফেসবুক স্ট্যাটাসে এভাবেই লিখেছেন পেয়ার আলী কলেজের সহকারী অধ্যাপক,নাট্যকার ও উপন্যাসিক মমিনুল ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *