বন্ধ্যাত্ব কেন হয় : কিছু কেস হিস্ট্রি

কেস-১
রোগীর নাম তানিয়া (ছদ্মনাম), বয়স ৩০। সে এসেছিল ফলিকুলোমট্রি রিপোর্ট নিয়ে। দেখলাম রিপোর্ট সেই একই অবস্থা, তার ওভারিয়ান ফলিকলগুলো ইনজেকশন দেয়ার পরও বড় হয়নি, অর্থাৎ রেজিস্টেন্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন তিনি পলিসিসটিক ওভারিয়ান সিনড্রোমে ভুগছিলেন, এখন আর ফলিকলগুলো কোনো ওষুধে বড় হচ্ছে না। উনি গত ১০ বছর যাবত বাচ্চা নেয়ার চেষ্টা করছেন, বিভিন্ন ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। একের পর এক ওভুলেশন হবার ওষুধ খেয়েছেন। কিন্তু এই ওষুধের তার ওভারি রেসপন্স করছে কিনা এটা আর দেখা হয়নি। এভাবেই ব্লাইন্ড ট্রিটমেন্ট চলছিল।

এটা শুধু তার ক্ষেত্রেই না, এরকম অনেক পেশেন্টই আসে যারা প্রপার ট্রিটমেন্ট না পেয়ে অনেক মূল্যবান সময় পার করে ফেলে এবং পরে অনেক চেষ্টা চালালেও আর ভালো ফলাফল পাওয়া যায় না।

ইনফার্টিলিটি চিকিৎসায় একটি বড় (Prognostic factor) প্রগ্নস্টিক ফ্যাক্টর হলো বয়স, কারণ বয়সের সাথে সাথে ওভারির ফলিকলের সংখ্যা কমে আসে এবং এগুলোর কোয়ালিটিও খারাপ হয়ে যায়। যার ফলে বাচ্চা হবার সম্ভাবনা কমতে থাকে। রিপোর্ট দেখে তাকে বললাম পরবর্তী চিকিৎসা হচ্ছে ল্যাপরোস্কপিক ওভারিয়ান ড্রিলিং করা, যাতে ওভারির রেসপন্স করার সম্ভাবনা বাড়ে এবং IVF (টেস্ট টিউব বেবি)-এর ব্যাপারেও কাউন্সেলিং করলাম। এরপরে তিনি অঝরে কান্না শুরু করে দিলেন।

রোগীনি শিক্ষিত হলেও যৌথ ফ্যামিলিতে সময় দিতে গিয়ে নিজের চাকরির কথা ভাবেননি। অথচ এখন তারা চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সাহায্য দিতে রাজি নয়। শুধু শ্বশুর-শাশুড়ি নয়, তার হাজবেন্ডও অনেক কটু কথা শোনায় বাচ্চা না হওয়ার জন্য। আমি তাকে অনেকভাবে সান্তনা দিতে চেষ্টা করলাম, বললাম নিজের সুদৃঢ় আইডেন্টিটি এবং পজিটিভ মনোভাব জীবনে অনেক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সাহায্য করতে পারে। আর সবকিছু আল্লাহর মর্জির উপর ছেড়ে দিলে অনেক দুঃচিন্তা লাঘব হয়ে যায়।

কেস-২
রোগীর বয়স ৩৫। বিয়ের প্রথম থেকেই তিনি বাচ্চা নেয়ার চেষ্টায় ছিলেন। কিছু দিন পরে কনসিভ হলেও ভাগ্যের পরিহাসে তিন মাসের মধ্যে এটি এবরশন হয়ে যায়। এর পর তারা আবারও চেষ্টা চালান, কিন্তু এবার আর কনসিভ হচ্ছিল না। একের পর এক ডাক্তার দেখিয়েছেন, ফলপ্রসূ হয়নি । এদিকে তার প্রতিমাসে মাসিকের সময় পেটে ব্যথা এবং রক্তপাত ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। পরিচিত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে যখন আমার চেম্বারে এলেন, তখন তার প্রধান সমস্যা মাসিকের সময় প্রচণ্ড তলপেটে ব্যথা এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ।

ইনভেস্টিগেশন করে দেখা গেল, হরমোন লেভেল নরমাল এবং ওভুলেশনে কোনো সমস্যা নেই, তবে আল্ট্রাসনোগ্রামে অনেক দিন আগে থেকেই তিন থেকে চার সেমির একটি চকলেট সিস্ট (chocolate cyst) পাওয়া যায়, যা এন্ডোমেট্রিওসিস (endometriosis) রোগের কারণে হয়ে থাকে। এই কারণে গত 5-6 বছর ধরে সে বিভিন্ন ডাক্তারের পরামর্শমতো মাঝে মাঝে ওভুলেশন হবার ওষুধ খেলেও তা কোনো কাজ করেনি। আমি তাকে এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটি কিভাবে কনসিভে বাধা সৃষ্টি করে সেটি বুঝিয়ে বললাম এবং এই সমস্যাটি এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে তা ভালোভাবে ডায়াগনোসিসের জন্য ল্যাপরোস্কপি করার পরামর্শ দিলাম। এরপর তারা ইন্ডিয়া যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সেখানেও যখন একই পরামর্শ দেয়া হলো তখন ল্যাপরোস্কপি করতে সম্মত হলেন।

ল্যাপরোস্কপি করে দেখা গেল ফ্রজেন পেলভিস (frozen pelvis) অর্থাৎ জরায়ু, ওভারি, ফেলোপিয়ান টিউব, ইন্টেসটাইন (নাড়িভুঁড়ি) সবগুলো এম ভাবে অ্যাডহেশন (একটার সাথে আরেকটা লেগে থাকা) হয়ে ছিল যে কোনোটাকেই আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় নরমালভাবে চেষ্টা করে কোনোভাবেই কনসিভ করা সম্ভব না। আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবি পদ্ধতি এর পরবর্তী চিকিৎসা।

কেস- ৩
রোগীর বয়স ২৪, হাজবেন্ডের ২৭; নতুন বিবাহিত দম্পতি। বিয়ের পর বাচ্চা নেয়ার জন্য এক বছর ট্রাই করে যখন ব্যর্থ হলেন তখন তারা বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন এবং একজন ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হলেন। সেখানে বেশকিছু টেস্ট করানোর পর চিকিৎসকের সহকারী তাদেরকে ল্যাপরোস্কপিক অপারেশন করার জন্য একটি ডেট দিলেন। সেইসাথে অ্যানেসথেটিক (অজ্ঞান করার জন্য) ফিটনেস দেখার জন্য কিছু ইনভেস্টিগেশন করতে বলা হলো। যেহেতু তারা ভালোভাবে বুঝতে পারলেন না অপারেশনটা কেন করা হবে তাই তারা পরে আমার চেম্বারে শরণাপন্ন হলেন।

আমি তাদের পূর্বের ইনভেস্টিগেশনে দেখলাম হাসবেন্ড এবং ওয়াইফ উভয়ের সব রিপোর্ট ভালো আছে, আর বন্ধ্যাত্বজনিত চিকিৎসা শুরু করার মতো এখনই কোনো ইনডিকেশন নাই, তাই তাদেরকে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই আরো ছয় মাস স্বাভাবিক পদ্ধতিতে বাচ্চা নেয়ার চেষ্টা করতে বললাম। আল্লাহর রহমতে এর ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যেই তারা কনসিভ করতে সমর্থ হন।

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)
সহযোগী অধ্যাপক (অবস-গাইনি)
ডেলটা মেডিকেল কলেজ, মিরপুর-১।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *